একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণিকক্ষগুলোতে। রাষ্ট্র যত শক্তিশালীই হোক, যদি শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়, তবে সে শক্তি টেকসই হয় না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন কেবল একটি খাতভিত্তিক ইস্যু নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘উপেক্ষিত ইস্যু’; নির্বাচনী ইশতেহারে থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে থাকে না। অবকাঠামো, মেগা প্রকল্প বা ক্ষমতার বয়ান যতটা আলোচনায় আসে, শ্রেণিকক্ষ ততটাই উপেক্ষিত। অথচ ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি জন্ম নেয় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বাস্তবতা থেকেই জনাব তারেক রহমানের রাষ্ট্রচিন্তায় শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন কেবল একটি খাতভিত্তিক পরিকল্পনা নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক দর্শন, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, মানুষই রাষ্ট্রের মূল সম্পদ। তাঁর প্রস্তাবিত শিক্ষাভাবনা কেবল পাঠ্যক্রম সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত মানবসম্পদ উন্নয়ন দর্শন, যেখানে প্রযুক্তি, আনন্দময় শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন এবং শিক্ষকের মর্যাদা—সবকিছু এক সুতোয় গাঁথা।
শিক্ষাখাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব প্রথম দর্শনে একটি সংখ্যাগত অঙ্গীকার মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি রাজনৈতিক অবস্থান। বাংলাদেশে বছরের পর বছর শিক্ষা সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, অথচ বরাদ্দের দিক থেকে শিক্ষা সবসময় পিছনের সারিতে থেকেছে। যার ফলাফল হলো শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোর দুরবস্থা, গবেষণার অনুপস্থিতি। জনাব রহমানের প্রস্তাব এই ভ্রান্ত ধারার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তা: শিক্ষা যদি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার না হয়, তবে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং প্রাথমিক-মাধ্যমিক পর্যায়ে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর পরিকল্পনা নিছক প্রযুক্তিগত সহায়তা নয়; এটি শিক্ষায় বিদ্যমান শ্রেণিগত ও ভৌগোলিক বৈষম্য ভাঙার একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ। বাংলাদেশে আজও গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শহরের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষকের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান প্রকট। প্রযুক্তিকে শিক্ষকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্র জ্ঞানপ্রবাহকে কেন্দ্রীভূত নয়, বিকেন্দ্রীকৃত করতে চায়। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এই উদ্যোগকে আরও কার্যকর করে তোলে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শিক্ষার্থীদের একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী দক্ষতা দিতে চাই, নাকি কেবল পুরোনো পাঠ্যবই নতুন কভারে পরিবেশন করেই দায়িত্ব শেষ করতে চাই?
ক্লাস সিক্স থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ চালুর প্রস্তাবটি বর্তমান পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি একটি মৌলিক সমালোচনা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বহুদিন ধরে মেধা নয়, বরং মুখস্থ শক্তিকে পুরস্কৃত করছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে একদল সার্টিফিকেটধারী তরুণ, যাদের সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার সক্ষমতা দুর্বল। আনন্দময় শিক্ষা মানে দায়িত্বহীনতা নয়; বরং এটি শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি করার রাষ্ট্রীয় কৌশল। এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়; তা হলো রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মানবিক বিকাশকে গুরুত্ব দিতে চায়।
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। এটি স্বীকার করে নেয় যে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার কেবল দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ এখনো কম দক্ষ ও কম আয়ের ফাঁদে আটকে আছে। ভাষাগত দক্ষতা ছাড়া এই বাস্তবতা বদলানো অসম্ভব। তাই বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আরবি, চীনা, জাপানি, কোরিয়ান বা ইউরোপীয় ভাষায় দক্ষতা বিদেশে কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বহুগুণে বাড়াতে পারে। এই প্রস্তাব সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেও যুক্ত। মাতৃভাষার মর্যাদা বজায় রেখেই বহুভাষিক দক্ষতা অর্জন; এটাই আধুনিক রাষ্ট্রের পরিচয়।
জনাব রহমানের মানবসম্পদ ভাবনার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারায় আনার স্পষ্ট অঙ্গীকার। দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা মানে রাষ্ট্র অবশেষে বাস্তবতাকে স্বীকার করছে; ডিগ্রি নিজে থেকে কর্মসংস্থান তৈরি করে না, দক্ষতা করে। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী বেকার নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাই এখানে মূল লক্ষ্য। স্কুল-কলেজে গ্রীষ্মের ছুটি কর্মমুখী কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব এই দর্শনকে আরও স্পষ্ট করে। এটি তরুণদের কেবল পরীক্ষার্থী নয়, বরং উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার একটি রাষ্ট্রীয় কৌশল।
সকল বিষয়ের মেধাবী শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানো অনেকের কাছে প্রতীকী মনে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান প্রতীক দিয়েই প্রকাশ পায়। যে রাষ্ট্র শিক্ষকদের সম্মান দেয় না, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মূল্য দিতে শেখাতে পারে না। একটি সমাজে শিক্ষককে যেভাবে দেখা হয়, সেই সমাজের ভবিষ্যৎও অনেকাংশে সেভাবেই গড়ে ওঠে। শিক্ষক মর্যাদা বাড়ানো মানেই শিক্ষাকে সম্মান দেওয়া।
স্নাতকোত্তর পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান নারীর ক্ষমতায়নের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি কেবল শিক্ষানীতি নয়; এটি দারিদ্র্য হ্রাস, স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং প্রজন্মান্তরের উন্নয়নের একটি কৌশল। এটি নারীকে দয়ার বস্তু নয়, বরং রাষ্ট্রের সমান অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একইভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার পরিকল্পনা শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারায় একটি বড় জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াস।
পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জ্ঞান উৎপাদন ও নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য সহজ স্টুডেন্ট লোন, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ বাংলাদেশের শিক্ষাকে বৈশ্বিক জ্ঞানপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করবে। এটি ‘ব্রেইন ড্রেইন’ নয়, বরং ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এর পথ তৈরি করতে পারে। এসব পরিকল্পনা একটি প্রশ্নের উত্তর দেয়: বাংলাদেশ কি কেবল জ্ঞান আমদানিকারক থাকবে, নাকি জ্ঞান উৎপাদক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবে?
জনাব রহমানের রাষ্ট্রচিন্তায় শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র নির্মাণ দর্শন। বলা যেতে পারে, এটি ক্ষমতার রাজনীতি থেকে সক্ষমতার রাজনীতিতে উত্তরণের প্রস্তাব। এই দর্শনের বাস্তবায়ন সহজ হবে না। কারণ, এই দর্শনের সফল বাস্তবায়ন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সামাজিক ঐকমত্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথে এগোবে। পরিশেষে, একটি কথা পরিষ্কার: শিক্ষাকে যদি রাষ্ট্রের কেন্দ্রে না আনা যায়, তবে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্ব—সবই থাকবে ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর।
–
রাষ্ট্র ভাবনায় শিক্ষা: জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের পরিকল্পনা
প্রফেসর ড. এম এম রহমান
দৈনিক যায়যায়দিন, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
