বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অবিশ্বাস, সংঘাত ও প্রতিশোধপরায়ণতার একটি সংস্কৃতি লক্ষ করা যায়। নির্বাচন মানেই বিভাজন, বিজয় মানেই প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা—এমন একটি ধারণা প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বাংলাদেশের ‘সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী’ তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের দুই নেতা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-এর আহবায়ক নাহিদ ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির চরমোনাই পীর সৈয়দ রেজাউল করীম, এঁর বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করা নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ভিন্ন বার্তা বহন করে।
নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিনয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিরল রাজনৈতিক দৃশ্য। বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস সুখকর নয়। ১৯৯১-পরবর্তী গণতান্ত্রিক যুগেও আমরা দেখেছি রাজনৈতিক মেরুকরণ কীভাবে সমাজ, প্রশাসন এবং এমনকি পরিবার পর্যন্ত বিভক্ত করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, প্রতিহিংসামূলক বক্তব্য—এসব যেন এক অঘোষিত রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় বিজয়ী নেতা নিজে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাসায় গিয়ে দেখা করা একটি শক্তিশালী প্রতীকী পদক্ষেপ। এটি কয়েকটি বার্তা দেয়: রাজনীতি মানেই শত্রুতা নয়, গণতন্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী মানেই রাষ্ট্রশত্রু নয়, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানেই একচ্ছত্র আধিপত্য নয়। এই প্রতীকী রাজনীতির গুরুত্ব কম নয়। কারণ রাজনীতিতে আচরণও একটি ভাষা, যা কখনো কখনো বক্তৃতার চেয়েও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। আমরা এটিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘সম্প্রীতি রাজনীতি’ খুব কমই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে নানা সময়েই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের ঘাটতি, আস্থার সংকট এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা ব্যাহত করেছে। যদি বিজয়ী পক্ষ সচেতনভাবে প্রতিপক্ষকে সম্মান দেখায়, তাহলে তা কয়েকটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে; সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা নিশ্চিত হতে পারে, নীতিনির্ধারণে পরামর্শভিত্তিক রাজনীতি শক্তিশালী হতে পারে, রাজনৈতিক সহিংসতা কমতে পারে, প্রশাসনে দলীয়করণের প্রবণতা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে, গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট ও নৈতিক উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। কিন্তু সেই শক্তির ব্যবহার কেমন হবে, তা নির্ধারণ করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরিত্র। বিজয়ের পর প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও সাক্ষাৎ একধরনের নৈতিক উচ্চতা প্রদর্শন করে। এতে জনগণের কাছে একটি বার্তা যায় যে, ক্ষমতা কেবল প্রতিপক্ষকে দমন করার উপায় নয়; বরং জাতীয় ঐক্য গঠনের সুযোগ। বাংলাদেশে অতীতে আমরা দেখেছি, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সহিংসতা, বিরোধ, বর্জন ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সে তুলনায় যদি বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষ পারস্পরিক সৌজন্য প্রদর্শন করে, তাহলে নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত হতে পারে।
সমালোচকরা প্রশ্ন তুলতে পারেন, এটি কি কেবল প্রতীকী রাজনীতি? নাকি সত্যিকারের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের সূচনা? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর; যেমন: সংসদে বিরোধী দলের মতামত কতটা গুরুত্ব পায়, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের সংস্কৃতি কমে কি না, জাতীয় ইস্যুতে সর্বদলীয় সংলাপ শুরু হয় কি না, এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সহিংসতা কমে কি না! যদি এই সাক্ষাৎ ভবিষ্যতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ সংস্কৃতির জন্ম দেয়, তবে এটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব পাবে। অন্যথায় এটি কেবল একটি ইতিবাচক কিন্তু সীমিত রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই থেকে যাবে।
বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ও ভোটার রাজনীতিতে শালীনতা, সহনশীলতা ও নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব দেখতে চায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে রাজনৈতিক আচরণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতীকী পদক্ষেপগুলো জনমনে বড় প্রভাব ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে বিজয়ের পর প্রতিদ্বন্দ্বীর বাসায় গিয়ে দেখা করা একটি নতুন রাজনৈতিক আখ্যান তৈরি করতে পারে, যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত বা দলগত শত্রুতা নয়।
উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্বাচনের পর বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর সৌজন্য সাক্ষাৎ কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা স্বাভাবিক চর্চা নয়; এটি গণতন্ত্রের গভীর সাংস্কৃতিক ভিত্তির বহিঃপ্রকাশ। এই চর্চার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক ধারণা, তা হলো লিগিটিমেসি বা বৈধতা। অর্থাৎ নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, তা সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে, এই বিশ্বাসকে সর্বসম্মতভাবে স্বীকার করা। একটি দেশের জন্য লিগিটিমেসি গুরুত্বপূর্ণ; কারণ—এটি প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে আস্থা বাড়ায়, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে, রাজনৈতিক সহিংসতা কমায়। যখন একটি দেশে নির্বাচনের ফলাফল শান্তিপূর্ণভাবে গৃহীত হয়, তখন আন্তর্জাতিক মহল সেটিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সূচক হিসেবে দেখে। বিদেশি বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন সহযোগী এবং কূটনৈতিক অংশীদাররা তখন দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হয়। বাংলাদেশেও যদি এই সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
আজকের বিশ্বে একটি দেশের গণতান্ত্রিক মানদণ্ড কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানবাধিকার, নির্বাচন ও সুশাসনের প্রশ্ন এখন বৈদেশিক নীতির অংশ। বাংলাদেশ যদি ধারাবাহিকভাবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন-পরবর্তী পরিবেশ, সৌজন্য ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক সূচকে অবস্থান উন্নত হতে পারে, উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা বাড়তে পারে, আঞ্চলিক নেতৃত্বে দেশের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-পরবর্তী এই সৌজন্য সাক্ষাৎ নিছক ব্যক্তিগত শালীনতা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তবে ইতিহাস সাক্ষী—প্রতীকী পদক্ষেপকে টেকসই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে ধারাবাহিকতা, নীতিগত দৃঢ়তা এবং পারস্পরিক আস্থা অপরিহার্য। যদি এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে সর্বদলীয় সংলাপ, নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি এবং সহনশীল রাজনৈতিক আচরণের ভিত্তি তৈরি করে, তাহলে একে নিঃসন্দেহে ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির বলা যাবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ যে মোড়ে দাঁড়িয়ে, সেখানে ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, রাজনৈতিক পরিপক্বতাই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
–
নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিনয়: সম্প্রীতির রাজনীতির সম্ভাব্য সূচনা
ড. এম এম রহমান
দৈনিক ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
