প্রথম দুই মাসের পথচলা: তারেক রহমান-এঁর নেতৃত্বে সরকারের নীতি, সম্ভাবনা ও আগামী দিনের অগ্রাধিকার

প্রথম দুই মাসের পথচলা: তারেক রহমান-এঁর নেতৃত্বে সরকারের নীতি, সম্ভাবনা ও আগামী দিনের অগ্রাধিকার

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কয়েক মাসই একটি সরকারের নীতি, দৃষ্টিভঙ্গি এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সময়ের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যৎ পাঁচ বছরের উন্নয়ন ধারাকে প্রভাবিত করে এবং জনগণের প্রত্যাশার সাথে সরকারের কার্যক্রমের সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, তা স্পষ্ট করে তোলে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এঁর নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের প্রথম দুই মাসে গৃহীত নানা উদ্যোগ, যেমন: সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সংস্কার, একটি সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশলের ইঙ্গিত দেয়। তবে এসব পদক্ষেপের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার উপর।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ও পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন সরকারের প্রথম দুই মাসের কার্যক্রম একটি উচ্চাভিলাষী, বহুমাত্রিক এবং সংস্কারমুখী নীতির ইঙ্গিত বহন করে। এত স্বল্প সময়ে এত বিস্তৃত খাতে উদ্যোগ গ্রহণ নিঃসন্দেহে একটি সক্রিয় ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রশাসনিক মনোভাবের প্রতিফলন।

প্রথমত, “ফ্যামিলি কার্ড” ও “কৃষক কার্ড” কর্মসূচি সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। নারীর হাতে সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়াতে পারে; বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে, যেখানে নারীর আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সীমিত। একইভাবে কৃষকদের জন্য ঋণ মওকুফ ও কার্ডভিত্তিক সুবিধা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করতে সহায়ক হতে পারে। তবে এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা।

দ্বিতীয়ত, সংসদীয় কার্যক্রমে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি এবং মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয়ে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, আইন প্রণয়ন যতটা সহজ, তার কার্যকর প্রয়োগ ততটাই কঠিন। এজন্য স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও শক্তিশালী নজরদারি কাঠামো অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, অবকাঠামো ও পরিবেশ খাতে ২০,০০০ কিলোমিটার নদী-খাল পুনঃখনন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সময়োপযোগী উদ্যোগ। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে জলাধার পুনরুদ্ধার কৃষি, মৎস্য এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেবে। তবে এসব প্রকল্পে দুর্নীতি ও নিম্নমানের কাজের ঝুঁকি সবসময় বিদ্যমান; যা কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে।

চতুর্থত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ১০,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হলেও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ ছাড়া তা অর্জন করা কঠিন হবে। একইভাবে পে-পালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালুর উদ্যোগ ফ্রিল্যান্সার ও আইটি খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

পঞ্চমত, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ড্রেস, জুতা ও ব্যাগ বিতরণ, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ চালু, আনন্দমুখী ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় স্মার্ট ক্লাসরুম ও প্রশিক্ষণভিত্তিক আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ প্রসংশার দাবি রাখে। এসব উদ্যোগ শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, দক্ষতাভিত্তিক ও আধুনিক করে তুলতে পারে; যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ষষ্ঠত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক নিয়োগ, বৃত্তি বৃদ্ধি এবং “ই-হেলথ কার্ড” চালুর পরিকল্পনা মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, প্রশিক্ষণের মান এবং সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সপ্তমত, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে সরকারের উদ্যোগ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাথে চুক্তির উদ্যোগ প্রবাসী আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। তবে অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা না গেলে এসব উদ্যোগের সুফল সীমিত থাকবে।

অষ্টমত, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি ৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮% এ উন্নীত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগ। এসব উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশ একটি বড়, স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।

নবমত, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালু, দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবস্থা এবং ট্রেন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পর্যায়ক্রমে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ দেশের যোগাযোগ, সেবা খাত ও ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করে তুলতে পারে।

দশমত, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের সাফল্য ইতিবাচক হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ চেইন উন্নয়ন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ও নিয়মিত তদারকি জরুরি।

আগামী পাঁচ বছরে সরকারের জন্য কয়েকটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সুশাসন জরুরি; দুর্নীতি দমন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে; শিল্পায়ন, এসএমই খাত এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়। শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে; কেবল অবকাঠামো নয়, শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে। স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকায়ন জরুরি; প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে বিশেষায়িত চিকিৎসা পর্যন্ত একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে; উপকূলীয় অঞ্চল, কৃষি এবং নগর ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে; ফিনটেক, ই-গভর্ন্যান্স এবং আইটি রপ্তানিতে আরও বিনিয়োগ করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে হবে। সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার করতে হবে; ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও জাতিগত বৈচিত্র্যের মধ্যে সমতা ও সহাবস্থান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এঁর নেতৃত্বে সরকারের প্রথম দুই মাসের উদ্যোগগুলো দিকনির্দেশনামূলক এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। নতুন সরকারের প্রথম দুই মাসের এই কার্যক্রম একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়; এই সরকার নীতিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথে এগোতে চায়। নারী, কৃষক, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে নেওয়া উদ্যোগগুলো জনমুখী রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিফলন ঘটায়, আর অবকাঠামো, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পরিকল্পনাগুলো ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তি রচনার ইঙ্গিত দেয়।

তবে বাস্তবতা হলো, উদ্যোগ গ্রহণের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেগুলোর সঠিক ও কার্যকর বাস্তবায়ন। প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ধারাবাহিকতা বজায় না থাকলে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলোর সুফল পুরোপুরি অর্জন করা কঠিন হবে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।

অতএব, আগামী দিনগুলোতে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে, ঘোষিত অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তব সাফল্যে রূপান্তর করা এবং জনগণের আস্থা অটুট রাখা। সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের সমন্বয়ে যদি এই পথচলা অব্যাহত থাকে এবং সরকার তার ঘোষিত প্রতিশ্রুতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হবে।

প্রথম দুই মাসের পথচলা: তারেক রহমান-এঁর নেতৃত্বে সরকারের নীতি, সম্ভাবনা ও আগামী দিনের অগ্রাধিকার, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, ৮ মে ২০২৬

ড. এম এম রহমান

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top