বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা এবং আস্থার সংকটে আবর্তিত। নির্বাচন, সরকার পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলন; সবকিছুর কেন্দ্রে থেকেছে কে ক্ষমতায় যাবে, কিন্তু রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে—এই প্রশ্নটি প্রায়ই আড়ালে রয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নটি কেবল সরকার গঠন বা ক্ষমতা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রদর্শন, যেখানে নাগরিক, প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, পরিবেশ ও সংস্কৃতি একত্রে একটি কার্যকর রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে বিকশিত হবে। বর্তমানে তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাবনা এই দৃষ্টিকোণ থেকেই আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর রাষ্ট্রভাবনা কেবল দলীয় রাজনীতির বৃত্তে আবদ্ধ নয়; বরং তা রাষ্ট্র পুনর্গঠন, নাগরিক অংশগ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা পারিবারিক উত্তরাধিকারের ভেতর জন্ম নিলেও তাঁর চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটেছে সময়, অভিজ্ঞতা ও জাতীয় সংকট বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শন এবং বেগম খালেদা জিয়ার আপোসহীন নেতৃত্বগুণ তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। তিনি একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি, এই সত্য যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি এটাও সত্য যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বক্তব্য ও পরিকল্পনায় একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশ ঘটেছে। এই স্বাতন্ত্র্যের মূল বৈশিষ্ট্য হলো রাষ্ট্রকে কেবল ক্ষমতার কাঠামো নয়, বরং নাগরিকদের সম্মিলিত দায়িত্ব ও অংশীদারিত্বের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা।
তারেক রহমানের বক্তব্যে বারবার যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো নাগরিক জাতীয়তাবাদ। তাঁর রাষ্ট্রভাবনার অন্যতম মৌলিক দিক হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ধারণা। তাঁর বক্তব্য ও পরিকল্পনায় প্রকাশ পেয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণা ক্ষমতাকেন্দ্রিক নয়, দায়িত্বকেন্দ্রিক। রাষ্ট্র কোনো একক দলের বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; বরং এটি নাগরিকদের সম্মিলিত চুক্তি। এই ধারণা নাগরিক জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে বিভিন্ন মত, ভাষা, শ্রেণি, ধর্ম বা সংস্কৃতির একরৈখিকতা নয়; বরং সংবিধান, গণতন্ত্র, অধিকার ও আইনের শাসনই জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মতভিন্নতা প্রায়ই শত্রুতায় রূপ নিয়েছে। জনাব রহমানের রাজনৈতিক বক্তব্য এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দেয়; যেখানে বিরোধ মানেই সংঘাত নয়, বরং মতের পার্থক্য গণতান্ত্রিক আলাপের অংশ। বাঙালি-অবাঙালি, ধর্মবিশ্বাসী-অবিশ্বাসী—সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ‘আমরা সবাই বাংলাদেশী’ পরিচয়কে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান তিনি দিয়েছেন। বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে এটি নিছক রাজনৈতিক শ্লোগান নয়; বরং একটি প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অবস্থান।
:
বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন:
রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রশ্নে তারেক রহমানের ভাবনা: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও নাগরিক দায়
-ড. এম এম রহমান
দৈনিক যায়যায়দিন, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
