আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এমন এক মুহূর্তে যখন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ গত কয়েক বছরে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং এর পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এ নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি ভোটারের গণ-ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত প্রকাশের মাধ্যমে সমগ্র জাতির আরেকটি আত্মপ্রকাশ হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল গণ-আন্দোলনের এক অসাধারণ অধ্যায়ে; ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, যখন মানুষের ত্যাগ ও সংগ্রাম পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দাবি জোরালোভাবে প্রকাশ করে। স্বাধীনতার ভিত্তি ছিল জনগণের অস্তিত্ব ও অধিকারের অনুভূতি, মানবাধিকারের জন্য লড়াই এবং সার্বভৌম সমাজের স্বপ্ন। এর মাধ্যমেই বাঙালী জাতি নিজের পরিচয় তৈরি করেছিল। ১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের পতনের পেছনে ছিল স্বভাবতই মানুষের গণভূমিকা; শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ একত্র হয়ে একটি স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সরিয়ে দেয়ার জন্য কাজ করেছিল। এই অধ্যায়ে মানবিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে জনগণ আরও সুদূরপ্রসারী প্রতিনিধিত্বের দাবি তুলেছিল। সম্প্রতি ২০২৪ সালে, আবারও বৈষম্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব; শুরু হয় ছাত্রদের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে, যা দ্রুতই সারাদেশের সকল শ্রেণি, বয়স ও পেশার মানুষের সমর্থন পায়। এই গণ-আন্দোলনে হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়, আর তা দেশের রাজনৈতিক পরিকাঠামো বদলে দেয়। যা আবারও জনগণের প্রতিনিধি ব্যবস্থাকে ফিরে আনার ডাক দেয়। তাই আগামী নির্বাচন গণতান্ত্রিক সংস্কারের একটি বড় সুযোগ।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়েছে, যার হাতে দায়িত্ব ছিল ভোট প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার করা এবং সার্বজনীন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা। এই নির্বাচনেই দায়িত্বশীল নাগরিকদের সুচিন্তিত মতামত ব্যালটের মাধ্যমে প্রকাশ করার সবচেয়ে বড় সুযোগ রয়েছে; যার মাধ্যমেই জনগণ তাদের ঐতিহাসিক দাবি, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সাংবিধানিক ন্যায়ের প্রতি অভিমত ব্যক্ত করবে।
বিএনপি ও তার জোট এই নির্বাচনে ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছে, যেখানে তারা উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং কর্মসংস্থানের পক্ষ নিয়ে প্রচার বাড়িয়েছে। আরেকদিকে জামায়াত-জোট কঠোর ধ্যান-ধারণায় জায়গা করে নিচ্ছে, যার প্রভাব সমাজে বৈষম্য এবং নারীর সম্প্রীতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ দুটি দিকই দেখাচ্ছে যে, এই নির্বাচন রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এবং তা কেবল একটি দলীয়-রাজনীতির প্রতিযোগিতা নয়; একটি জাতীয় স্বপ্ন ও মূল্যবোধের টানাপোড়েনও।
আশা করা যায়, যেমনটি ১৯৭১ সালে মানুষ স্বাধীনতার লালিত স্বপ্ন দেখেছিল, ১৯৯০ সালে গণতন্ত্রের দাবি করেছিল, ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল; তেমনিভাবে ২০২৬ সালের ভোটার প্রতিটি ব্যালটের মাধ্যমে তাদের চেতনা ও দায়িত্ব পালন করবে। এক্ষেত্রে কিছু মূল বিষয় অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে:
- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে; যেখানে নাগরিক অংশগ্রহণই মূল চালিকাশক্তি। ভোটাররূপে আপনাদের দায়িত্ব হবে সেই চেতনাকে ব্যালটে রূপ দেওয়া।
- ভোটদানের সময় শুধুমাত্র ব্যক্তিগত লাভ বা ক্ষতির কারণে নয়; বরং দেশের সার্বিক কল্যাণ, সংবিধানিক ন্যায্যতা ও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ভোট দিতে হবে।
- নারী, সংখ্যালঘু, দরিদ্র ও তরুণদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সমাজের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। সকল শ্রেণির মানুষের চিন্তা-চেতনা ভোটে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
এই নির্বাচন শুধুই একটি দলীয়-রাজনীতির লড়াই নয়; এটি হচ্ছে একটি জনগণের আত্ম-সমীক্ষা, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ এবং ঐতিহাসিক সংগ্রামের স্পিরিটে একটি নতুন অধ্যায় তৈরির প্রয়াস। ভোটারদের সুচিন্তিত মতামত ও দায়বদ্ধ অংশগ্রহণই হবে সেই শক্তি, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের মতো আবারও নিজেকে পুনর্ব্যক্ত করতে পারবে এবং একটি গণতান্ত্রিক সমাজ হিসেবে নিজেদের আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে। সেই বিশ্বাস নিয়ে, বাংলাদেশ আগামীকাল আবারো ব্যালটের মাধ্যমে একটি নিরাপদ, সম্মানজনক, ও গণতান্ত্রিক “ব্যালট বিপ্লব” ঘটাতে যাচ্ছে।
–
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬: একটি নিরাপদ, সম্মানজনক, ও গণতান্ত্রিক ‘ব্যালট বিপ্লব’ প্রত্যাশা
প্রফেসর ড. এম এম রহমান
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
