রাষ্ট্র ভাবনায় আইসিটি

রাষ্ট্র ভাবনায় আইসিটি: কর্মসংস্থানভিত্তিক ডিজিটাল রূপরেখা
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন এখন আর কেবল অবকাঠামো, সেতু কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। একবিংশ শতাব্দীর রাষ্ট্রচিন্তায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়ন কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, কতটা দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলছে এবং কতটা টেকসই অর্থনীতির ভিত রচনা করছে। এই প্রেক্ষাপটে জনাব তারেক রহমান-এঁর রাষ্ট্রভাবনায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের অগ্রাধিকার একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা বহন করে।

জনাব রহমানের ঘোষিত রূপরেখা অনুযায়ী, আইসিটি খাতকে দ্রুত সক্রিয় ও উৎপাদনমুখী করতে পাঁচটি কৌশলগত উপখাতে সরাসরি প্রায় দুই লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশনভিত্তিক অর্থনীতির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আরও প্রায় আট লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় দশ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান—যা বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যাগত বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

আইসিটি খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই পাঁচটি খাত হলো—সাইবার নিরাপত্তা, বিপিও (বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং), এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ও ডেটা সায়েন্স, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং ইন্ডাস্ট্রি ৪.০।

প্রথমত, সাইবার নিরাপত্তা। ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাইবার নিরাপত্তা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অংশ। ব্যাংকিং, নির্বাচন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রতিরক্ষা—সব ক্ষেত্রেই সাইবার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এই খাতে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা মানে শুধু কর্মসংস্থান নয়, বরং রাষ্ট্রের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা। আধুনিক রাষ্ট্রের প্রশাসন, অর্থনীতি ও নাগরিক সেবা ক্রমেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ফলে এই ডিজিটাল অবকাঠামো যত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই সাইবার আক্রমণ, তথ্য চুরি ও ডিজিটাল নাশকতার ঝুঁকিও বাড়ছে। সময়োপযোগী বিনিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই খাত শক্তিশালী করা গেলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রা আরও নিরাপদ ও টেকসই হবে।

দ্বিতীয়ত, বিপিও খাত। এটি এমন একটি পদ্ধতি যেখানে একটি কোম্পানি তার নিজস্ব বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের দায়িত্ব তৃতীয় কোনো পক্ষ বা বাহ্যিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করায়। বাংলাদেশে তরুণ, ইংরেজি-দক্ষ এবং প্রযুক্তি-সচেতন মানবসম্পদ বিপিও খাতের জন্য বড় সম্পদ। ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো যেভাবে বিপিও শিল্পকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎসে পরিণত করেছে, বাংলাদেশও সঠিক নীতি সহায়তা ও অবকাঠামো পেলে সেই পথে এগোতে পারে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় না। এই বাস্তবতায় বিপিও খাত দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে। অতএব, সঠিক নীতি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে বিপিও খাত বাংলাদেশের জন্য শুধু কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রই নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি শক্তিশালী ইঞ্জিনে পরিণত হতে পারে।

তৃতীয়ত, এআই ও ডেটা সায়েন্স। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়; এটি বর্তমান অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কৃষি থেকে স্বাস্থ্য, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা থেকে আর্থিক সেবা—সবখানেই এআই ও ডেটা বিশ্লেষণের ব্যবহার বাড়ছে। এই খাতে বিনিয়োগ মানে উচ্চমানের দক্ষতা সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি করা। এআই ও ডেটা সায়েন্সে বিনিয়োগের মাধ্যমে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা অ্যানালিস্ট, মেশিন লার্নিং গবেষক এবং এআই নীতিবিদসহ বহুমাত্রিক পেশার সৃষ্টি হয়, যেগুলো তুলনামূলকভাবে উচ্চ আয় ও আন্তর্জাতিক বাজারমুখী। উন্নত দেশগুলো তো বটেই, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক রূপান্তরেও এআই ও ডেটা বিশ্লেষণ ক্রমেই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে।

চতুর্থত, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প। বিশ্ব অর্থনীতিতে সেমিকন্ডাক্টর এখন কৌশলগত পণ্য। যদিও বাংলাদেশ এই শিল্পে এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিংয়ের মতো নির্দিষ্ট সেগমেন্টে প্রবেশের বাস্তব সম্ভাবনা আছে। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, গাড়ি, চিকিৎসা যন্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইন্ডাস্ট্রি ৪.০—প্রায় সব আধুনিক প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো সেমিকন্ডাক্টর চিপ। ফলে এই শিল্পে আধিপত্য কেবল অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। তাছাড়া, এটি দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। অতএব, সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক লাভের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এটি শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি নয়, বরং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

পঞ্চমত, ইন্ডাস্ট্রি ৪.০। অটোমেশন, রোবোটিক্স, আইওটি এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের যুগে শিল্পখাতের আধুনিকায়ন ছাড়া টিকে থাকা কঠিন। ইন্ডাস্ট্রি ৪.০-তে বিনিয়োগ মানে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি সক্ষমতা উন্নয়ন এবং নতুন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর চাকরি সৃষ্টি। বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তনের ফলে যারা প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না, তারা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমনির্ভর শিল্প থেকে দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে রূপান্তর ছাড়া ভবিষ্যৎ শিল্প অর্থনীতিকে টেকসই রাখা কঠিন। সময়মতো এই বিনিয়োগ করা গেলে বাংলাদেশ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প অর্থনীতিতে সফলভাবে রূপান্তর ঘটাতে পারে।

এর পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন বাংলাদেশের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও দ্রুত বিকাশমান সম্ভাবনাময় খাত। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসের সহজপ্রাপ্যতার কারণে ইতোমধ্যে লক্ষাধিক বাংলাদেশি তরুণ-তরুণী আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। গ্রাফিক ডিজাইন, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, ভিডিও এডিটিং, লেখালেখি, অ্যানিমেশন ও সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্ট তৈরির মতো নানা ক্ষেত্রে তারা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন; প্রচলিত চাকরির গণ্ডির বাইরে থেকেও। এই খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এখানে প্রবেশের জন্য বড় মূলধন বা জটিল অবকাঠামোর প্রয়োজন নেই। একটি ল্যাপটপ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতাই একজন তরুণকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে যুক্ত করতে পারে। কিন্তু এই খাত এখনো নীতিগত স্বীকৃতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে পিছিয়ে আছে। পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিলে এই খাত থেকেই লাখ লাখ তরুণের স্বনির্ভর কর্মসংস্থান সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ফ্রিল্যান্সিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন তরুণদের চাকরিপ্রত্যাশী নয়, বরং স্বনির্ভর উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ দেয়। এই খাতে বিনিয়োগ মানে শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়; এটি একটি আত্মনির্ভর, উদ্ভাবনী এবং বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত প্রজন্ম তৈরির প্রক্রিয়া।

তবে এসব পরিকল্পনা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন হবে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সংস্কার, শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আইনের শাসন এবং সর্বোপরি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। আইসিটি খাত বিকাশের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশও অপরিহার্য।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ভোটারদের সিদ্ধান্ত শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিকনির্দেশ নির্ধারণের বিষয়। কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন—এই তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনের রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। জনাব রহমানের আইসিটি-কেন্দ্রিক রাষ্ট্রভাবনা সেই ভবিষ্যতের একটি রূপরেখা তুলে ধরে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নির্ভর করবে ভোটারদের সুচিন্তিত, দায়িত্বশীল এবং ভবিষ্যতমুখী সিদ্ধান্তের ওপর। কারণ একটি ভোট শুধু ব্যালট নয়—এটি আগামী প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনার ওপরও প্রভাব ফেলে।
:
রাষ্ট্র ভাবনায় আইসিটি: কর্মসংস্থানভিত্তিক ডিজিটাল রূপরেখা
প্রফেসর ড. এম এম রহমান
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top