“ফুল দেখো, প্রেমে পড়ো”—রাষ্ট্রীয় নীতির নতুন সিলেবাস?

“ফুল দেখো, প্রেমে পড়ো”—রাষ্ট্রীয় নীতির নতুন সিলেবাস?, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, ৩১ মার্চ ২০২৬

চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় বসন্তকালীন ছুটিতে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেছে, “ফুল দেখো এবং প্রেমে পড়ো।” শুনতে যেন মনে হচ্ছে কোনো কবির বাণী, কবিতার লাইন; কিংবা বসন্তের বিকেলে প্রেমিক-প্রেমিকার গোপন আলাপ। কিন্তু না, এটি একেবারে অফিসিয়াল নোটিশ! সিচুয়ান সাউথওয়েস্ট ভোকেশনাল কলেজ অব এভিয়েশন তাদের শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দিয়েছে যে, ১ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটিতে বই বন্ধ, মন খুলে প্রকৃতি আর রোমান্স উপভোগ করো।

একাডেমিক জীবনের কঠোরতার মধ্যে এই নির্দেশনা যেন আচমকা এক চায়ের কাপে ঝড়। যেখানে সাধারণত শিক্ষার্থীদের বলা হয়, “পড়ো, আরও পড়ো, না পড়লে ভবিষ্যৎ অন্ধকার”; সেখানে হঠাৎ বলা হচ্ছে, “পড়া বন্ধ করো, প্রেমে পড়ো!” ব্যাপারটা এতটাই অপ্রত্যাশিত যে মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে হয়তো কোনো কবি বা নাট্যকার ঢুকে পড়েছিলেন!

কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এই ‘রোমান্সের ডাক’ আসলে নিছক আবেগ নয়; এর পেছনে রয়েছে কঠিন অর্থনীতি আর জনসংখ্যার অঙ্ক। চীন, ১৪০ কোটির দেশ, দীর্ঘদিন ধরে ‘এক সন্তান নীতি’র কঠোর বাস্তবতায় নিজেদের জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নিয়ন্ত্রণই হয়ে উঠেছে নতুন সংকট। এখন দেশটি জন্মহারের ভয়াবহ পতনের মুখে। ২০২৫ সালে টানা চতুর্থ বছরের মতো জনসংখ্যা কমেছে, যা একসময় অকল্পনীয় ছিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাবে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে, এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হবে।

এই প্রেক্ষাপটে “ফুল দেখো, প্রেমে পড়ো” স্লোগানটি আর নিছক রোমান্টিক থাকে না; এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ। যেন বলা হচ্ছে, “প্রেম করো, বিয়ে করো, সন্তান নাও—দেশকে বাঁচাও!” এখানে মজার বিষয় হলো, আগে যেখানে পরিবারগুলো সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল, এখন সেখানে সরকার নিজেই বলছে, “দয়া করে একটু বেশি ভালোবাসুন!” বিষয়টি কিছুটা এমন—যেন একসময় শিক্ষক কঠোর শাসনে ছাত্রকে পড়াতেন, আর এখন বলছেন, “বাবা, একটু হাসো-খেলো, না হলে তুমি পাশ করলেও দেশ ফেল করবে!”

অন্যদিকে, এই উদ্যোগের আরেকটি দিক হচ্ছে দেশে বিয়ে ও অভ্যন্তরীণ ভোগব্যায় বাড়ানো। অর্থনীতির ভাষায়, মানুষ বিয়ের পরে যখন বেশি ভ্রমণ করে, ঘুরে বেড়ায়, তখন তারা বেশি খরচ করে; হোটেল, খাবার, পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই। ফলে অর্থনীতির চাকা একটু দ্রুত ঘোরে। তাই বসন্তের ছুটিতে ‘ফুল দেখা ও রোমান্স করা’ মানে শুধু বসে বসে ফুল দেখা আর রোমান্স করা নয়; এটি এক ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম।

এখন প্রশ্ন হলো, প্রেম বা রোমান্স কি নোটিশ দিয়ে হয়?

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হয়তো আশা করছে, ছয় দিনের ছুটিতে শিক্ষার্থীরা পার্কে যাবে, ফুল দেখবে, কারও চোখে চোখ রাখবে, আর সেখান থেকেই জন্ম নেবে নতুন সম্পর্ক, নতুন রোমান্স। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। আজকের শিক্ষার্থীরা স্মার্টফোনে বেশি সময় কাটায়, প্রেমের আগে তারা প্রোফাইল দেখে, ‘সীন’ করে, ‘রিপ্লাই’ দেয় না—এ এক নতুন যুগের রোমান্স। তাই “ফুল দেখো, প্রেমে পড়ো” নির্দেশনা হয়তো অনেকের কাছে হয়ে দাঁড়াবে, “ফুলের ছবি তোলো, ফেসবুকে দাও, লাইক গুনো!”

আরেকটি বিষয় হলো, প্রেমকে যদি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বানানো হয়, তাহলে কি সেটি আর প্রেম থাকে? প্রেম তো স্বতঃস্ফূর্ত, হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া এক অনুভূতি। সেখানে যদি বলা হয়, “এই ছয় দিনে প্রেম করতে হবে”; তাহলে সেটি কিছুটা পরীক্ষার মতো হয়ে যায়। যেন প্রশ্নপত্রে লেখা, “প্রশ্ন ১: একটি সফল প্রেম কিভাবে শুরু করবেন? (১০ নম্বর)”

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা কল্পনা করলে দৃশ্যটি আরও মজার হয়ে ওঠে। ধরুন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নোটিশ দিল, “আগামী সপ্তাহে বসন্তকালীন ছুটি। সবাইকে প্রেমে পড়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।” তখন হয়তো অভিভাবকরা বলবেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে কি পড়াশোনা হয়, না প্রেম শেখানো হয়?” আবার শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ হয়তো বলবে, “স্যার, প্রেমের জন্য কি সিলেবাস বা সাজেশন দেওয়া হবে?”

তবে সব রসিকতার বাইরে, এই উদ্যোগের মধ্যে একটি মানবিক দিকও আছে। আধুনিক জীবনের চাপ, প্রতিযোগিতা, ক্যারিয়ার দৌড়—সব মিলিয়ে তরুণদের জীবন অনেকটাই যান্ত্রিক হয়ে গেছে। সেখানে কিছুটা অবসর, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা—এসব মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়টি সেটিই বলতে চেয়েছে। জীবন শুধু সিজিপিএ নয়, শুধু ক্যারিয়ার নয়; জীবন মানে কিছুটা ফুল, কিছুটা বাতাস, কিছুটা প্রকৃতি, আর কিছুটা ভালোবাসাও।

কিন্তু রাষ্ট্র যখন এই বার্তাটি দেয়, তখন সেটি আর নিছক জীবনদর্শন থাকে না; এটি হয়ে ওঠে নীতির অংশ। আর এখানেই জন্ম নেয় এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব; যেখানে প্রেমও যেন পরিকল্পনার অংশ, অনুভূতিও যেন পরিসংখ্যানের উপাদান। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকে যায়—এই উদ্যোগ কি সত্যিই কাজ করবে? ছয় দিনের ছুটিতে কি জন্মহার বাড়বে? ফুল দেখে কি সত্যিই প্রেম বাড়ে? আর প্রেম বাড়লেই কি সন্তান জন্মাবে?

সম্ভবত এর উত্তর এত সহজ নয়। সমাজ, অর্থনীতি, ব্যক্তিগত পছন্দ—সবকিছু মিলিয়েই জন্মহারের মতো জটিল বিষয় নির্ধারিত হয়। শুধু একটি নোটিশ দিয়ে সেটি বদলানো কঠিন। তবুও, এই উদ্যোগ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—যে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোর, পরিকল্পিত রাষ্ট্রগুলোর একটিও শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক অনুভূতির কাছেই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থাৎ, সব হিসাব-নিকাশের শেষে দাঁড়িয়ে আছে একটি সহজ সত্য; অর্থনীতি, নীতি, পরিসংখ্যান—সবকিছুর ওপরে মানুষ। আর মানুষের জীবনে প্রেমের জায়গা এখনো অদ্বিতীয়।

তাই হয়তো বলা যায়, এই নোটিশটি যতটা না শিক্ষার্থীদের জন্য, তার চেয়েও বেশি—একটি দেশের জন্য। একটি দেশ যেন বলছে, “আমরা অনেক হিসাব করেছি, এবার একটু ভালোবাসা হোক।”

“ফুল দেখো, প্রেমে পড়ো”—রাষ্ট্রীয় নীতির নতুন সিলেবাস?, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, ৩১ মার্চ ২০২৬

ড. এম এম রহমান

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top