চন্দ্রাভিযান : আর্টেমিস-২ মিশনের মহাকাব্যিক যাত্রা

চন্দ্রাভিযান: আর্টেমিস-২ মিশনের এক মহাকাব্যিক যাত্রা, ntv online, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

মানুষের আকাশপানে তাকানোর ইতিহাস বহু প্রাচীন। কিন্তু সেই আকাশের রহস্য ভেদ করে চাঁদের বুকে পৌঁছানো মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। চন্দ্রাভিযান শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়; এটি মানুষের কৌতূহল, সাহস এবং অজানাকে জানার অদম্য ইচ্ছার প্রতীক। ২০২৬ সালের এপ্রিলে দীর্ঘ ৫০ বছরের অপেক্ষার পর মানুষ আবার চাঁদের পথে রওনা হয়েছে; এক নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন আর নতুন প্রযুক্তির হাত ধরে শুরু এ যাত্রার। এই ঐতিহাসিক চন্দ্রাভিযানের নাম ‘আর্টেমিস-২’। চাঁদে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয় মূলত ঠান্ডা যুদ্ধের সময়। ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘লুনা-২’ মহাকাশযান প্রথম মানবসৃষ্ট বস্তু হিসেবে চাঁদের মাটিতে পৌঁছে ইতিহাস তৈরি করে। এরপর শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মহাকাশ প্রতিযোগিতা।

চাঁদ শুধু একটি উপগ্রহ নয়, এটি যেন ভবিষ্যৎ মহাকাশ গবেষণার কেন্দ্র; যেখানে পানি ও জীবনের সম্ভাবনা রয়েছে। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ভবিষ্যতের পানীয় জল, অক্সিজেন উৎপাদন ও রকেট জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে। চাঁদে হিলিয়াম-৩ এর মতো বিরল উপাদান রয়েছে, যা ভবিষ্যতের জ্বালানি হতে পারে। তাছাড়া চাঁদ হতে পারে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার ‘স্টপেজ’ এবং গভীর মহাকাশ গবেষণার কেন্দ্র।

চাঁদে মানুষের প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ‘অ্যাপোলো-১১’ মিশনের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই; ২০ জুলাই মানুষ প্রথম চাঁদে অবতরণ করে। এই মিশনের অন্যতম নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রেখে বলেন, “একজন মানুষের জন্য এটি ছোট পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য বিশাল লাফ।” এরপর ১৯৭২ সালে ‘অ্যাপোলো-১৭’ ছিল মানুষের শেষ চন্দ্রাভিযান।

১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নাসা’ পরিচালিত ‘অ্যাপোলো’ কর্মসূচির অধীনে মোট ৬ বার মানুষ সফলভাবে চাঁদে অবতরণ করে। এই সময়ে অ্যাপোলো-১১, ১২, ১৪, ১৫, ১৬ এবং ১৭ মিশনের মাধ্যমে মোট ১২ জন মহাকাশচারী চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন। ‘অ্যাপোলো-১৩’ মহাকাশযানটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চাঁদে অবতরণ করতে পারেনি। ‘অ্যাপোলো-১৭’-এর পর থেকে প্রায় পাঁচ দশক ধরে মানুষ আর চাঁদে যায়নি। কিন্তু কেন? কারণ ছিল বিশাল ব্যয়, রাজনৈতিক আগ্রহ কমে যাওয়া এবং নতুন গবেষণার অগ্রাধিকার পরিবর্তন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, চাঁদই ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণার মূল চাবিকাঠি।

এই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয় নাসা’র ‘আর্টেমিস’ প্রোগ্রাম। এই প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল আবার মানুষকে চাঁদে পাঠানো, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে গবেষণা করা, স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির সম্ভাবনা যাচাই এবং ভবিষ্যতে সেখান থেকে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার প্রস্তুতি। প্রথম ধাপ ছিল নাসার ‘আর্টেমিস-১’ মনুষ্যবিহীন পরীক্ষা মিশন, যেটি ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। চন্দ্রাভিযান শেষে ২৫ দিন পর ১১ ডিসেম্বর মহাকাশযান ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলটি সফলভাবে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল চাঁদে মানুষ পাঠানোর পূর্বে রকেট ও মহাকাশযানের নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং ভবিষ্যৎ মানব মিশনের সম্ভাবনা যাচাই করা।

এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক ‘আর্টেমিস-২’ মিশন; যেখানে মানুষ আবার চাঁদের পথে। ১০ দিনের এই মিশনে অংশগ্রহণ করেন চারজন সাহসী নভোচারী; রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং জেরেমি হ্যানসেন। ২০২৬ সালের ১লা এপ্রিল তাঁরা চড়ে বসেন মহাকাশযান ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলে। তাঁদের গন্তব্য একটাই, চাঁদের কক্ষপথ ভ্রমণ; কিন্তু তাঁদের লক্ষ্য আরও বড়, মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা। মিশনের লক্ষ্য ছিল আর্টেমিস-২ সরাসরি চাঁদে অবতরণ করবে না; বরং এটি একটি ‘লুনার ফ্লাইবাই’ মিশন, চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসা। মূল উদ্দেশ্যগুলো হলো মানুষের জন্য গভীর মহাকাশ ভ্রমণের সক্ষমতা পরীক্ষা, ওরিয়ন ক্যাপসুলের পারফরম্যান্স যাচাই, চাঁদের দূরবর্তী অংশ পর্যবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ অবতরণের প্রস্তুতি।

চিত্র-১: আর্টেমিস-২ মিশনের চারজন সদস্য, তারা হলেন মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ (উপরে বাঁদিকে), মিশন স্পেশালিস্ট জেরেমি হ্যানসেন (নিচে বাঁদিকে), কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান (নিচে ডানদিকে) এবং পাইলট ভিক্টর গ্লোভার (উপরে ডানদিকে); সবাই সূর্যগ্ৰহণ দেখার জন্য বিশেষ চশমা ব্যবহার করছেন। (ছবি: নাসা)

১লা এপ্রিল, ২০২৬; লঞ্চের মুহূর্তে পুরো পৃথিবী যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে ছিল। পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক… রকেট গর্জে উঠলো; পৃথিবী কাঁপলো। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছেড়ে মহাশূন্যের নিস্তব্ধতায় ভেসে উঠলেন। রিড ওয়াইজম্যান জানালার বাইরে তাকিয়ে যেন বললেন, “এটাই আমাদের ঘর…আর আমরা এখন তা ছেড়ে যাচ্ছি।” পৃথিবী নামক নীল গ্রহটা ধীরে ধীরে ছোট হতে লাগলো। সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা পেরিয়ে, দিন কেটে যাচ্ছে। তারা এখন পৃথিবী থেকে এমন দূরত্বে পৌঁছেছেন, যেখানে আগে খুব কম মানুষ গিয়েছে।

‘আর্টেমিস-২’ মিশনের মহাকাশযান ওরিয়ন ক্যাপসুলটি পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করেছিল ৬ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে। ওই দিন মহাকাশযানটি চাঁদের উল্টো পিঠ (ফার সাইড) প্রদক্ষিণ করার সময় একটি নতুন বিশ্বরেকর্ড তৈরি করে। মিশন কন্ট্রোল থেকে বার্তা আসে, “আপনারা এখন মানব ইতিহাসে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করছেন।” এই মিশনে নভোচারীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ২,৫২,৭৫৬ মাইল দূরত্বে পৌঁছান; যা মানব ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ দূরত্ব। ১৯৭০ সালে ‘অ্যাপোলো-১৩’ মিশনের নভোচারীদের গড়া ২,৪৮,৬৫৫ মাইলের রেকর্ডটি ভেঙে যায়। ‘অ্যাপোলো-১৩’ মিশনটি মূলত চাঁদে অবতরণের জন্য ছিল, কিন্তু যাত্রাপথে একটি বড় দুর্ঘটনা (অক্সিজেন ট্যাংক বিস্ফোরণ) ঘটে। ফলে তারা চাঁদে নামতে পারেননি। জীবন বাঁচানোর জন্য মহাকাশযানটিকে চাঁদের চারপাশ ঘুরিয়ে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হয়। কাজেই, ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের নভোচারীরা এখন পর্যন্ত মহাকাশে সবথেকে দূরে ভ্রমণকারী মানুষ। এই সময়ে ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলটি চাঁদের সবেচেয়ে কাছে প্রায় ৪,০৬৭ মাইল উপর দিয়ে উড়ে যায়। ভিক্টর গ্লোভার যেন হেসে বলেন, “আমরা ইতিহাসের ভেতর দিয়ে ভেসে যাচ্ছি।” কিন্তু এই যাত্রা শুধু রেকর্ড ভাঙার নয়, এটি অজানাকে জানার যাত্রা।

অবশেষে নভোচারীরা পৌঁছালেন চাঁদের অদৃশ্য একদিকে, যা পৃথিবী থেকে কখনো দেখা যায় না। ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের সময় যখন তারা চাঁদের আড়ালে চলে যান, তখন পৃথিবীর সাথে তাদের যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১০ মিনিট নয়, ২০ মিনিট নয়, প্রায় ৪০ মিনিটের মত সময় যোগাযোগ ছাড়া ছিলেন নভোযাত্রীরা। চাঁদ একটি কঠিন গোলাকার বস্তু। যখন মহাকাশযানটি চাঁদের এমন পাশে চলে যায় যা পৃথিবীর বিপরীত দিকে, তখন চাঁদ নিজেই সিগন্যালের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়; ফলে রেডিও যোগাযোগ সরাসরি পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে না। মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে, এই সময়টাকে বলা হয় ‘ব্ল্যাকআউট পিরিয়ড’। আগের ‘অ্যাপোলো-৮’ মিশনেও একই ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা হয়েছিল। বর্তমান প্রযুক্তি উন্নত হলেও, সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা এখনো রয়েছে। তাই চাঁদের আড়ালে গেলে প্রায় আধা ঘণ্টার মতো পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ থাকে না; এটি মহাকাশ অভিযানের একটি স্বাভাবিক ও পরিকল্পিত অংশ। এই সময়টুকুই আসলে নভোচারীদের জন্য সবচেয়ে নিঃশব্দ, রহস্যময় এবং রোমাঞ্চকর মুহূর্ত।

চারপাশে নিস্তব্ধতা। শুধু ধূসর, গর্তে ভরা চাঁদের পৃষ্ঠ। ক্রিস্টিনা কোচ যেন ধীরে বললেন, “এই নীরবতা যেন মহাবিশ্বের হৃদস্পন্দন।” তার সংগে জেরেমি হ্যানসেন যোগ করলেন, “আমরা এখন এমন এক জায়গায়, যেখানে মানুষের উপস্থিতি বিরল।” হঠাৎ কিছু একটা ঘটলো। রিড জানালার দিকে তাকিয়ে থমকে গেলেন, “সবাই এখানে আসো।” সবাই ভেসে এলেন জানালার পাশে। চাঁদের দিগন্তের ওপাশে দেখা গেল, নীল-সাদা এক গোলক, আমাদের পৃথিবী। কিন্তু এটি উঠছে না, ধীরে ধীরে নিচে নামছে। মানে, পৃথিবী ডুবে যাচ্ছে। “আর্থসেট”—রিড ফিসফিস করে বললেন।

চিত্র-২: আর্টেমিস-২ মিশনের ওরিয়ন মহাকাশযান যখন চাঁদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সন্ধ্যা ৬:৪১ মিনিটে (EDT) জানলা দিয়ে এই ‘আর্থসেট’ বা পৃথিবীর অস্ত যাওয়ার দৃশ্যটা ক্যামেরাবন্দি করা হয়। (ছবি: নাসা)

এই দৃশ্য মানব ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ঘটনা। ৫৮ বছর আগে অ্যাপোলো-৮ মিশনে বিল অ্যানডার্স “আর্থরাইজ” এর ছবি তুলেছিলেন, যা ছিল চাঁদের দিগন্তে পৃথিবীর উদয়। আর ৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে, মানুষ প্রথমবারের মতো পৃথিবীর অস্ত দেখছে। রিড ওয়াইজম্যান নাইকন ডি৫ ক্যামেরাটি দ্রুত চালু করলেন। তারপর তিনি ক্যামেরার শাটার ক্লিক করলেন; ঐতিহাসিক এক দৃশ্য ধারণ করা হলো, যেখানে পৃথিবী ধীরে ধীরে চাঁদের পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে। এটিই ছিল এই মিশনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত; চাঁদের আকাশে পৃথিবীর অস্ত যাওয়া। চাঁদের দিগন্তের ওপাশে ধীরে ধীরে পৃথিবী নিচে নামছিল; একটি নীল, অসম্ভব সুন্দর গ্রহ ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল। এই দৃশ্য দেখে নভোচারীরা মুগ্ধ হয়ে যান। এই মুহূর্তের বেশ কিছু ছবি ধারণ করা হয়, যা ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করে।

কয়েক মুহূর্ত কেউ কিছু বললো না। ভিক্টর ধীরে বললেন, “ওখানেই আমাদের সবকিছু… যুদ্ধ, ভালোবাসা, পরিবার!” জেরেমি বললেন, “এবং আমরা এখানে দাঁড়িয়ে বুঝছি—সবকিছু কত ছোট, আর কত মূল্যবান।” রিড তার লগবুকে লিখলেন, “আজ আমরা পৃথিবীকে অস্ত যেতে দেখলাম। কিন্তু বুঝলাম, মানুষের স্বপ্ন কখনো অস্ত যায় না।” কয়েক দিন চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে তারা আবার পৃথিবীর পথে রওনা হলেন। ক্রিস্টিনা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা ফিরে যাচ্ছি… কিন্তু আমরা বদলে গেছি।” ওরিয়ন ক্যাপসুলে নিঃশব্দ উত্তেজনা। রিড ওয়াইজম্যানও জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন। দূরে, একটি নীল গোলক ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে। “ওটাই আমাদের পৃথিবী!”—তিনি ধীরে বললেন।

নাসার ‘আর্টেমিস ২’ মিশনের ৪ মহাকাশচারী যুক্তরাষ্ট্র সময় ১০ এপ্রিল ২০২৬-এ সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরেছেন। তাদের বহনকারী ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলটি বাংলাদেশ সময় ১১ এপ্রিল সকাল ৬টা ৭ মিনিটে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে সফলভাবে অবতরণ করেছে। এটি প্রায় ১০ দিনের একটি ঐতিহাসিক চন্দ্রাভিযান ছিল। এই সফল অভিযানটি ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী বেস ক্যাম্প তৈরি, চাঁদ থেকে মঙ্গল অভিযান এবং মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর পথ প্রশস্ত করবে।

চিত্র-৩: আর্টেমিস-২ মিশনের ওরিয়ন মহাকাশযানটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে সফলভাবে অবতরণ করে। (ছবি: নাসা)

এই মিশনের গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের মহাকাশে ফিরে আসা; ৫০ বছর পর মানুষ আবার চাঁদের পথে, এটি প্রযুক্তিগত ও মানসিক এক বিশাল অগ্রগতি। এটি ত্বরান্বিত করবে ভবিষ্যৎ মিশনের প্রস্তুতি; এর সফলতা নির্ধারণ করবে পরবর্তী ‘আর্টেমিস-৩’ মিশনের পথ। চাঁদে বৈজ্ঞানিক গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে; চাঁদের নতুন অঞ্চল, বিশেষ করে দক্ষিণ মেরু, যেখানে পানি ও সম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। এই মিশনে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণ রয়েছে; অর্থাৎ মহাকাশ এখন আর একক দেশের বিষয় নয়।

এই মিশন শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি একটি নতুন যুগের সূচনা। এটি ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিয়েছে। এরপর ২০২৭ সালে আসতে পারে ‘আর্টেমিস-৩’ মিশন, যেখানে মানুষ আবার চাঁদের মাটিতে পা রাখবে। ‘আর্টেমিস-২’ মিশনে পৃথিবীর অস্ত যাওয়ার সেই দৃশ্য মানুষকে নতুন করে শিখিয়েছে, আমরা ছোট, কিন্তু আমাদের স্বপ্ন বিশাল; আমরা দূরে যেতে পারি, কিন্তু শিকড় আমাদের পৃথিবীতেই; মহাবিশ্ব বিশাল, কিন্তু মানুষ তার থেকেও বড়, তার স্বপ্নে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের এই যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ কখনো থেমে থাকে না, অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষাই আমাদের এগিয়ে নেয়, এবং চাঁদ শুধু একটি গন্তব্য নয়, এটি ভবিষ্যতের দরজা। তাই ‘আর্টেমিস-২’ মিশন হলো মানুষের ফিরে আসা, আর মহাবিশ্বের দিকে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার এক ঐতিহাসিক গল্প।

চন্দ্রাভিযান: আর্টেমিস-২ মিশনের এক মহাকাব্যিক যাত্রা, ntv online, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

ড. এম এম রহমান

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top