২০২৬ সালে বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠন হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি; আর ১০ মার্চ ২০২৬ খ্রি. তারিখে রাজধানীর বনানী টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেছেন। সরকার গঠনের মাত্র ২১ দিনের মাথায় নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত একটি কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি নতুন কিছু নয়; নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দলই জনগণের কাছে উন্নয়ন, কল্যাণ ও পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নির্বাচনের পর সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর অনেকই সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। সে অর্থে ভোটের কালি মুছে যাওয়ার আগেই একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধনের মাধ্যমে সরকার শুধু একটি প্রশাসনিক প্রকল্প শুরু করেনি; বরং একটি নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করেছে—রাজনীতি কেবল প্রতিশ্রুতির ভাষা নয়, বরং বাস্তবায়নের দায়বদ্ধতাও।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিএফ, খাদ্য সহায়তা—এ ধরনের বহু কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করে আসছে। তবে এসব কর্মসূচি প্রায়ই খণ্ডিত এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্যোগের ধারণাটি সেই বিচ্ছিন্ন কাঠামোকে একটি পরিবারভিত্তিক পরিচয়ের মধ্যে নিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একটি পরিবারকে একটি ইউনিট হিসেবে ধরে তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা অন্যান্য মৌলিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে এই কার্ডের মাধ্যমে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে জুন মাস নাগাদ ৩৭,৫৬৪টি পরিবার এই কার্ড পাচ্ছে; এটি সংখ্যায় ছোট মনে হলেও নীতিগতভাবে একটি পাইলট বা পরীক্ষামূলক ধাপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যে কোনো বড় সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে সীমিত পরিসরে তা চালু করে এর কার্যকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো: পরিবারের নারী প্রধানের নামে ও তাদের হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা। সামাজিক কল্যাণ নীতিতে নারীকে কেন্দ্র করে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ধারণা নতুন নয়; বিশ্বের অনেক দেশেই এই পদ্ধতি কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, পরিবারের অর্থনৈতিক সহায়তা বা খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা নারীর হাতে গেলে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের কল্যাণে ব্যয় হয়; বিশেষ করে শিশুদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায়। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায়ও এই নীতির গুরুত্ব রয়েছে। বহু নিম্নবিত্ত পরিবারে নারীরাই সংসারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব পালন করেন, যদিও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের ভূমিকা অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সেই অদৃশ্য ভূমিকার একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে চার কোটি পরিবারের নারী প্রধানের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক ঘোষিত এই উদ্যোগের মূল দর্শন হলো: পরিবারভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সেই নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে নারীদের স্থান দেওয়া। যদি এই পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু একটি প্রশাসনিক প্রকল্প হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমাজে নারীর মর্যাদা, ক্ষমতায়ন এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কাজেই, এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আসতে পারে; এবং সেই সংগে সামাজিক বৈষম্য হ্রাস পেতে পারে।
তবে এত বড় কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে;
প্রথমত, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত দরিদ্র বা প্রান্তিক মানুষকে চিহ্নিত করা। ভুল তালিকা, রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে অনেক সময় প্রকৃত উপকারভোগীরা বাদ পড়ে যান।
দ্বিতীয়ত, তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস তৈরি করা যায়, তাহলে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; বরং একটি ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্মে রূপ নিতে পারে।
তৃতীয়ত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। বড় সামাজিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে দুর্নীতি বা অপব্যবহারের ঝুঁকি সবসময় থাকে। তাই স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের সক্রিয় নজরদারি এই কর্মসূচির সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। অনেক পরিবারে এখনও নারীর নামে সরকারি সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে সামাজিক সংকোচ বা ভুল ধারণা থাকতে পারে। এই মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য সামাজিক প্রচার ও সচেতনতা প্রয়োজন।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির সূচনা একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়ই একটি প্রশ্ন দেখা যায়—নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়িত হবে? এই উদ্যোগ সেই প্রশ্নের একটি প্রাথমিক উত্তর হিসেবে সামনে এসেছে। সরকার গঠনের মাত্র ২১ দিনের মাথায়, ভোটের কালি মুছে যাওয়ার আগেই, একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ইতিবাচক দিক হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে একটি দূরত্বের অভিযোগ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ জনগণের আস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে।
জনাব তারেক রহমান-এঁর এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি সম্ভাবনাময় সামাজিক কর্মসূচি। এটি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হতে পারে; তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করা সহজ, কিন্তু সেই পরিকল্পনাকে প্রশাসনিক দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে কার্যকর করে তোলা অনেক বেশি কঠিন কাজ। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি যদি প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, যদি এটি দুর্নীতি ও অনিয়মমুক্ত থাকে, এবং যদি এটি একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপ নেয়; তাহলে এটি বাংলাদেশের সামাজিক নীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
রাজনীতির মূল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার বাস্তব প্রভাব দিয়ে—মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারল, সেটাই মূল প্রশ্ন। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির সূচনা সেই পরিবর্তনের একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এটি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে; বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য। ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি যদি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে, তাহলে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা নতুন করে গড়ে উঠতে পারে। আর সেই আস্থাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি।
–
‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়ন: নারীর সামাজিক নিরাপত্তার নতুন সম্ভাবনা, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, ২০ এপ্রিল ২০২৬
ড. এম এম রহমান
